এক চিলতে রোদ্দুর

Story by Shahidul Alam

সূর্য তখন সবে উঠি উঠি করছে । শীতের সকাল, তাই আলোর তেজ যৎসামান্য । জায়গাটি গাছ-গাছারি দিয়ে পরিপূর্ণ । মাঝখানে আছে একটি বিশাল জলাধার । জলাধারের চারদিকে তৈরি করা হয়েছে পদব্রজে পাক (রাউন্ড) দেবার জন্য সিমেন্টে মোড়ানো পাকা গাথান রাস্তা । অন্য সময় এখানটা নানা বয়সী পার্ক প্রেমীদের পদচারনায় মুখরিত থাকে । আজ একটু ব্যাতিক্রম । অল্প বয়সী এক দঙ্গল স্কুল পড়ুয়াদের একটি বর্ণিল সমাবেশ ঘটেছে গুলশান লেডিজ পার্কে । আর একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ওরা ঘিরে রেখেছে কিছু বিশেষ প্রকৃতির মানুষকে। এ বিশেষ প্রকৃতির মানুষেরা হুইলচেয়ারে উপবিষ্ট। কি যেন চলছে ওখানটায়।

খুলেই বলি । ঐ বিশেষ প্রকৃতির মানুষদের আমিও একজন । একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে আমার ওখানে যাওয়া । আয়োজক একজন মহীয়সী নারী । তাঁকে আমরা সবাই চিনি । তাঁর নাম ভালেরি টেইলর । প্রতিবন্ধীদের কল্যাণ কল্পে যিনি নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন । প্রতি বছর তিনি এই বিশেষ প্রকৃতির অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকেন একটি বিশেষ প্রকৃতির মানব গোষ্ঠীর চিত্তের নির্মল প্রশান্তির জন্য । ওরা যেহেতু ভাগ্যের অমোঘ নির্মম বিধানের কারনে নিরুপায় ও পীড়িত, তাই এ ধরনের প্রয়াস ওদের জীবনে অন্য মানে এনে দেয় ।

অনুষ্ঠানের মূল পর্বগুলো হল, স্কুল পড়ুয়াদের সাথে প্রতিবন্ধীদের প্রীতি সম্ভাষণ ও কথোপকথনের সুযোগ করে দেওয়া, সবাই মিলে জলাধারটির চতুর্দিকে কয়েক পাক পদভ্রমন করা, প্রতিবন্ধিত্বের কারন ও রোধ সংক্রান্ত তথ্যচিত্র দেখান ও সবশেষে সামান্য পানাহার ।

সবার মত আমিও একখানে স্থির হলাম । মাইকে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হল, হুইলচেয়ারে উপবিষ্টদের দুটো সারিতে আসতে । জলাধারের চতুর্দিকে কয়েক পাক চক্কর দিতে হবে । প্রতিটি হুইলচেয়ারের সাথে থাকবে দুজন করে স্কুল পড়ুয়া ।

হঠাৎ পেছনে একটা মিষ্টি আওয়াজ পেলাম । দেখলাম দুজন চোদ্দ পনের বছরের কিশোরী হাসিমুখে । একজন লম্বা, অন্যজন সামান্য খাটো । দুজনই সুন্দরী, তবে যে আমায় শুধোল সে একটু বেশীই সুন্দরী । মেয়েটি বলছিল –

– আংকেল ভাল আছেন ?
– হ্যাঁ ভাল । তুমি ?
– আমিও ভাল ।
– আমরা আপনার সাথে যেতে পারি ?
– অবশ্যই । এসো ।

আমি হুইলচেয়ার চালাতে শুরু করলাম । পাশাপাশি আমার সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগল দুপাশে দুজন মিষ্টি স্কুল পড়ুয়া কিশোরী ।

– আপনার ভাল লাগছে না আঙ্কেল ! আমার খুউব ভাল লাগছে…
– আমারও ।
জিজ্ঞেস করলাম – তোমার নাম কি ?
– বর্ণ । আর এই যে আমার বান্ধবী, ওর নাম স্বর্ণা ।
– সুন্দর নাম । কোন ক্লাসে পড় ?
– ক্লাস নাইনে ।
– কোন স্কুলে ?
– গুলশান মডেল স্কুলে ।
– ওটা কি শুধু গার্লসদের স্কুল ?
– না আঙ্কেল, ছেলেরাও পড়ে ।
– ওদের দেখছি না যে !
– হি হি… স্যাররা ওদের আসতে দেয় নি ।
– কেন ?
– ওরা আসলে যে শুধু দুষ্টুমি করবে, ছুটাছুটি দৌড়াদৌড়ি করবে… ওরা তো শুধু ওসবই করে… বলে দুবান্ধবী হাসতে লাগল ।

– দ্যাখেন দ্যাখেন ঐ যে আমাদের স্কুল ! পার্কের সাথে লাগোয়া একটি স্থাপনা দেখাল বর্ণ ।

প্রথম পরিক্রমা (রাউন্ড) শেষ হল ।

– আঙ্কেল আপনার কেমন লাগছে ? আমার এখানে আসতে ভীষণ ভাল লাগে ।
– তোমাদের সাথে আমারও খুব ভাল লাগছে ।
– কাল যখন স্যাররা এ অনুষ্ঠানের কথা বললেন আমি সাথে সাথে রাজী হয়েছি আর আম্মুকে বলেছি আমি যাবই ।
– গুড ।

– ঐখানে একটা হরিণ ছিল ।
– হ্যাঁ আমি জানি । আমিও দেখেছি ।
স্বর্ণা বলল – হরিণটা মনে হয় মরে গেছে ।
বর্ণ – যাবেই তো ! একা একা কেউ বাঁচতে পারে ?
আমি – ঠিকই বলেছ । সবারই সঙ্গী দরকার ।

দুটো রাউন্ড শেষ হল । কিশোরীটিকে আমার ইতিমধ্যে ভাল লাগতে শুরু হয়েছে । কি সুন্দর মেয়েটি – উচ্ছল প্রাণচাঞ্চল্য আর উদ্দীপনায় ভরা । আমার জীবনটা যদি স্বাভাবিক হত হয়ত এমনটিই একটি মেয়ে থাকতো আমার । এভাবেই হয়ত আমায় কথার ফুলঝরিতে মুগ্ধ করে রাখত… । দীর্ঘশ্বাস ফেললাম একটা…। 

– আঙ্কেল আপনি কোথায় থাকেন ?
– বারিধারা ডিওএইচএসে । কাছেই তো ! ওদিকে যাও তুমি ?
– হ্যাঁ । আব্বুর সাথে মাঝে মাঝে গাড়ীতে করে বেড়াতে যাই ।
– তাহলে আব্বুকে নিয়ে একদিন এস আমাদের বাসায় !
– যাব । আঙ্কেল আপনি কিন্তু আমাদের বাসায় আসবেন ।
– কোথায় তোমাদের বাসা ?
– গুলশান লেক পার্কটা আছে না, ওর পাশেই আমাদের বাসা । বাসা নম্বর… রোড নম্বর…।
– ও ।
– আসবেন আঙ্কেল । আমার আম্মু খুব মজা করে রাঁধে । আপনার খুব ভাল লাগবে ।
– তোমার আব্বু কি করেন ?
– ব্যাবসা করেন । – কিসের ব্যবসা ?
– ইন্টারনেটে আউটসোর্সিং করেন ।
– তাই নাকি । আমিও তো ওটাই করি । তোমরা কয় ভাইবোন ?
– আমি একাই আঙ্কেল ।
– অর্থাৎ একমাত্র মেয়ে ! আর তুমি ? তুমি যে কথাই বলছ না।
স্বর্ণা – আমরা দু ভাইবোন আঙ্কেল ।
বর্ণ হেসে বলে – ও ভীষণ লজ্জা পায় আঙ্কেল । বলছিল কিভাবে যে বড়দের সাথে আলাপ করবে…
আমি – না না সবার সাথে মিশতে হয়, বুঝেছ ?
– ও কিন্তু এখানে অন্য একটা কারনে এসেছে বুঝেছেন ?
বলে জিভ কাটল বর্ণ । তারপর দুজনই হেসে উঠল । আঁচ করলাম কি চলছে । স্বাভাবিক, এটাই তো ওদের বয়স ওসব করবার ।

আমি বিষয় পালটালাম ।
– আচ্ছা তোমরা কি হতে চাও ?
বর্ণ – আমি পার্লারের কোর্স করতে মালায়শিয়া যাব । আব্বু বলেছে, আমায় পাঠাবে ।
– বাহ ! তোমার জন্য খুব ভাল হবে ওটা । এমনিই তো তুমি দেখতে বেশ সুন্দরী । আর তুমি স্বর্ণা ?
– আমি বিসনেস করব । জানেন, বর্ণ না আর্মিতেও যেতে চায় !
– পার্লারের কোর্স করে আবার আর্মিতে ? দুটো দুরকম হল না । আর তাছাড়া আর্মির জীবন যে খুব কঠিন !
বর্ণ – আমি পারব আঙ্কেল । আব্বু বলেছে সবকিছু শিখতে ।
– অবশ্যই পারবে । খুব ভাল করবে তুমি । অনেক উপরে উঠবে । 

পার্কটার এক অংশে একটি গেটের মত জায়গা আছে, যার ভেতর দিয়ে পথ । ওখানটায় এক ভদ্রলোককে দেখে বর্ণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল । বলল – আঙ্কেল, কেমন আছেন ? … … আমাদের একটা ছবি তুলে দেন না ! … … আব্বুর ফেসবুকে দেবেন কিন্তু ! আজকেই দেবেন ।
পরে বর্ণ বলল ভদ্রলোক নাকি ওর বাবার বন্ধু ।
– তোমার বাবার কি ফেসবুক আছে ?
– হ্যাঁ ।
– তোমার নেই ?
– না । আমার ই-মেইল আইডি আছে ।
তারপর বর্ণ ওর বাবার নাম, ওর ই-মেইল আইডি, ঠিকানা এসব বলতে লাগল।
আমি বললাম – এত কিছু মনে থাকবে না, পরে লিখে দিয়ো ।
– আচ্ছা ।

তৃতীয় রাউন্ড শেষ হল । মাইকে বলল আরও দুটো রাউন্ড নাকি দিতে হবে। আমি ক্ষ্যান্ত দিলাম ।
বললাম – আর যাব না ।
বর্ণ বলল – চলেন না আঙ্কেল, খুব মজা হচ্ছিল ।
– না দ্যাখো, আমার চেয়ারের চার্জ শেষ হয়ে যাবে, এটি ব্যাটারিতে চলে । বাসায় পৌঁছতে পারব না ।
– আচ্ছা ঠিক আছে । তাহলে কাগজ কলম দেন । আমার ঠিকানা লিখে দি।
একজন স্বেচ্ছাসেবী এগিয়ে এসে কাগজ-কলম দিল ।
বর্ণ চটপট লিখে ফেরত দিয়ে বলল – আসবেন কিন্তু ! আম্মুর রান্না খুব মজা । আপনার ভাল লাগবে ।
তারপর ওরা চলে গেল ।

আমি ওখানটায় বসলাম । অনেকগুলো চেয়ারে অতিথিবৃন্দ বসে আছেন । তাদের আশেপাশে স্কুল পড়ুয়ারা ভিড় করেছে । সাদা একটি পর্দায় কতিপয় নাট্য ব্যক্তিত্বের অভিনীত একটি জনসচেতনতা মূলক নাটিকা দেখানো হচ্ছে । মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, মাথায় করে বোঝ বা ওজন নিলে হঠাৎ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে পারে । তাই মজুর, মুটেদের এ অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে ।

এবার পানাহারের পালা । এসময়ে বর্ণ আর ওর বান্ধবী এসে বিদায় নিল । বার বার ওর বাসায় যাবার প্রতিশ্রুতি নিল । আমি দিলাম । কিন্তু জানি ওর সাথে ক্ষনিকের সুখকর সান্নিধ্যের এটাই ইতি, এবং এটাই স্বাভাবিক ।

অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথ ধরলাম । মনের অতল গভীরে রয়ে গেল বর্ণ নামক শীতের সকালে এক চিলতে মিষ্টি রোদ্দুরের সাথে বর্ণিল সময় কাটানোর স্নিগ্ধ, সুখকর আবেশের মূর্ছনা । ক্ষনিকের সে মুহূর্তগুলো অনেকদিন আমার মানসপটে সুখের ছোঁয়া লেপে রাখবে ।

ভ্যালেরি, তোমায় লাল সেলাম । তোমার উদ্যোগ সম্পূর্ণ সফল । লেখাটি যেদিন শেষ করলাম সেদিন ক্যালেন্ডারের পাতায় চোদ্দই ফেব্রুয়ারি । জানেন তো কোন দিন এটি ? অবশ্যই সমগ্র বিশ্বে সার্বজনীন ভালবাসা দিবস । বিনম্র শুভ কামনা রইল সে সমস্ত বাবাদের প্রতি, যারা তাঁদের মিষ্টি কন্যাটিকে ভীষণ ভালবাসেন । দীর্ঘজীবী হোক পিতা-পুত্রির ভালবাসা…।

Advertisements

2 responses to “এক চিলতে রোদ্দুর

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s