এক চিলতে রোদ্দুর

Story by Shahidul Alam

সূর্য তখন সবে উঠি উঠি করছে । শীতের সকাল, তাই আলোর তেজ যৎসামান্য । জায়গাটি গাছ-গাছারি দিয়ে পরিপূর্ণ । মাঝখানে আছে একটি বিশাল জলাধার । জলাধারের চারদিকে তৈরি করা হয়েছে পদব্রজে পাক (রাউন্ড) দেবার জন্য সিমেন্টে মোড়ানো পাকা গাথান রাস্তা । অন্য সময় এখানটা নানা বয়সী পার্ক প্রেমীদের পদচারনায় মুখরিত থাকে । আজ একটু ব্যাতিক্রম । অল্প বয়সী এক দঙ্গল স্কুল পড়ুয়াদের একটি বর্ণিল সমাবেশ ঘটেছে গুলশান লেডিজ পার্কে । আর একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ওরা ঘিরে রেখেছে কিছু বিশেষ প্রকৃতির মানুষকে। এ বিশেষ প্রকৃতির মানুষেরা হুইলচেয়ারে উপবিষ্ট। কি যেন চলছে ওখানটায়।

খুলেই বলি । ঐ বিশেষ প্রকৃতির মানুষদের আমিও একজন । একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে আমার ওখানে যাওয়া । আয়োজক একজন মহীয়সী নারী । তাঁকে আমরা সবাই চিনি । তাঁর নাম ভালেরি টেইলর । প্রতিবন্ধীদের কল্যাণ কল্পে যিনি নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন । প্রতি বছর তিনি এই বিশেষ প্রকৃতির অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকেন একটি বিশেষ প্রকৃতির মানব গোষ্ঠীর চিত্তের নির্মল প্রশান্তির জন্য । ওরা যেহেতু ভাগ্যের অমোঘ নির্মম বিধানের কারনে নিরুপায় ও পীড়িত, তাই এ ধরনের প্রয়াস ওদের জীবনে অন্য মানে এনে দেয় ।

অনুষ্ঠানের মূল পর্বগুলো হল, স্কুল পড়ুয়াদের সাথে প্রতিবন্ধীদের প্রীতি সম্ভাষণ ও কথোপকথনের সুযোগ করে দেওয়া, সবাই মিলে জলাধারটির চতুর্দিকে কয়েক পাক পদভ্রমন করা, প্রতিবন্ধিত্বের কারন ও রোধ সংক্রান্ত তথ্যচিত্র দেখান ও সবশেষে সামান্য পানাহার ।

সবার মত আমিও একখানে স্থির হলাম । মাইকে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হল, হুইলচেয়ারে উপবিষ্টদের দুটো সারিতে আসতে । জলাধারের চতুর্দিকে কয়েক পাক চক্কর দিতে হবে । প্রতিটি হুইলচেয়ারের সাথে থাকবে দুজন করে স্কুল পড়ুয়া ।

হঠাৎ পেছনে একটা মিষ্টি আওয়াজ পেলাম । দেখলাম দুজন চোদ্দ পনের বছরের কিশোরী হাসিমুখে । একজন লম্বা, অন্যজন সামান্য খাটো । দুজনই সুন্দরী, তবে যে আমায় শুধোল সে একটু বেশীই সুন্দরী । মেয়েটি বলছিল –

– আংকেল ভাল আছেন ?
– হ্যাঁ ভাল । তুমি ?
– আমিও ভাল ।
– আমরা আপনার সাথে যেতে পারি ?
– অবশ্যই । এসো ।

আমি হুইলচেয়ার চালাতে শুরু করলাম । পাশাপাশি আমার সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগল দুপাশে দুজন মিষ্টি স্কুল পড়ুয়া কিশোরী ।

– আপনার ভাল লাগছে না আঙ্কেল ! আমার খুউব ভাল লাগছে…
– আমারও ।
জিজ্ঞেস করলাম – তোমার নাম কি ?
– বর্ণ । আর এই যে আমার বান্ধবী, ওর নাম স্বর্ণা ।
– সুন্দর নাম । কোন ক্লাসে পড় ?
– ক্লাস নাইনে ।
– কোন স্কুলে ?
– গুলশান মডেল স্কুলে ।
– ওটা কি শুধু গার্লসদের স্কুল ?
– না আঙ্কেল, ছেলেরাও পড়ে ।
– ওদের দেখছি না যে !
– হি হি… স্যাররা ওদের আসতে দেয় নি ।
– কেন ?
– ওরা আসলে যে শুধু দুষ্টুমি করবে, ছুটাছুটি দৌড়াদৌড়ি করবে… ওরা তো শুধু ওসবই করে… বলে দুবান্ধবী হাসতে লাগল ।

– দ্যাখেন দ্যাখেন ঐ যে আমাদের স্কুল ! পার্কের সাথে লাগোয়া একটি স্থাপনা দেখাল বর্ণ ।

প্রথম পরিক্রমা (রাউন্ড) শেষ হল ।

– আঙ্কেল আপনার কেমন লাগছে ? আমার এখানে আসতে ভীষণ ভাল লাগে ।
– তোমাদের সাথে আমারও খুব ভাল লাগছে ।
– কাল যখন স্যাররা এ অনুষ্ঠানের কথা বললেন আমি সাথে সাথে রাজী হয়েছি আর আম্মুকে বলেছি আমি যাবই ।
– গুড ।

– ঐখানে একটা হরিণ ছিল ।
– হ্যাঁ আমি জানি । আমিও দেখেছি ।
স্বর্ণা বলল – হরিণটা মনে হয় মরে গেছে ।
বর্ণ – যাবেই তো ! একা একা কেউ বাঁচতে পারে ?
আমি – ঠিকই বলেছ । সবারই সঙ্গী দরকার ।

দুটো রাউন্ড শেষ হল । কিশোরীটিকে আমার ইতিমধ্যে ভাল লাগতে শুরু হয়েছে । কি সুন্দর মেয়েটি – উচ্ছল প্রাণচাঞ্চল্য আর উদ্দীপনায় ভরা । আমার জীবনটা যদি স্বাভাবিক হত হয়ত এমনটিই একটি মেয়ে থাকতো আমার । এভাবেই হয়ত আমায় কথার ফুলঝরিতে মুগ্ধ করে রাখত… । দীর্ঘশ্বাস ফেললাম একটা…। 

– আঙ্কেল আপনি কোথায় থাকেন ?
– বারিধারা ডিওএইচএসে । কাছেই তো ! ওদিকে যাও তুমি ?
– হ্যাঁ । আব্বুর সাথে মাঝে মাঝে গাড়ীতে করে বেড়াতে যাই ।
– তাহলে আব্বুকে নিয়ে একদিন এস আমাদের বাসায় !
– যাব । আঙ্কেল আপনি কিন্তু আমাদের বাসায় আসবেন ।
– কোথায় তোমাদের বাসা ?
– গুলশান লেক পার্কটা আছে না, ওর পাশেই আমাদের বাসা । বাসা নম্বর… রোড নম্বর…।
– ও ।
– আসবেন আঙ্কেল । আমার আম্মু খুব মজা করে রাঁধে । আপনার খুব ভাল লাগবে ।
– তোমার আব্বু কি করেন ?
– ব্যাবসা করেন । – কিসের ব্যবসা ?
– ইন্টারনেটে আউটসোর্সিং করেন ।
– তাই নাকি । আমিও তো ওটাই করি । তোমরা কয় ভাইবোন ?
– আমি একাই আঙ্কেল ।
– অর্থাৎ একমাত্র মেয়ে ! আর তুমি ? তুমি যে কথাই বলছ না।
স্বর্ণা – আমরা দু ভাইবোন আঙ্কেল ।
বর্ণ হেসে বলে – ও ভীষণ লজ্জা পায় আঙ্কেল । বলছিল কিভাবে যে বড়দের সাথে আলাপ করবে…
আমি – না না সবার সাথে মিশতে হয়, বুঝেছ ?
– ও কিন্তু এখানে অন্য একটা কারনে এসেছে বুঝেছেন ?
বলে জিভ কাটল বর্ণ । তারপর দুজনই হেসে উঠল । আঁচ করলাম কি চলছে । স্বাভাবিক, এটাই তো ওদের বয়স ওসব করবার ।

আমি বিষয় পালটালাম ।
– আচ্ছা তোমরা কি হতে চাও ?
বর্ণ – আমি পার্লারের কোর্স করতে মালায়শিয়া যাব । আব্বু বলেছে, আমায় পাঠাবে ।
– বাহ ! তোমার জন্য খুব ভাল হবে ওটা । এমনিই তো তুমি দেখতে বেশ সুন্দরী । আর তুমি স্বর্ণা ?
– আমি বিসনেস করব । জানেন, বর্ণ না আর্মিতেও যেতে চায় !
– পার্লারের কোর্স করে আবার আর্মিতে ? দুটো দুরকম হল না । আর তাছাড়া আর্মির জীবন যে খুব কঠিন !
বর্ণ – আমি পারব আঙ্কেল । আব্বু বলেছে সবকিছু শিখতে ।
– অবশ্যই পারবে । খুব ভাল করবে তুমি । অনেক উপরে উঠবে । 

পার্কটার এক অংশে একটি গেটের মত জায়গা আছে, যার ভেতর দিয়ে পথ । ওখানটায় এক ভদ্রলোককে দেখে বর্ণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল । বলল – আঙ্কেল, কেমন আছেন ? … … আমাদের একটা ছবি তুলে দেন না ! … … আব্বুর ফেসবুকে দেবেন কিন্তু ! আজকেই দেবেন ।
পরে বর্ণ বলল ভদ্রলোক নাকি ওর বাবার বন্ধু ।
– তোমার বাবার কি ফেসবুক আছে ?
– হ্যাঁ ।
– তোমার নেই ?
– না । আমার ই-মেইল আইডি আছে ।
তারপর বর্ণ ওর বাবার নাম, ওর ই-মেইল আইডি, ঠিকানা এসব বলতে লাগল।
আমি বললাম – এত কিছু মনে থাকবে না, পরে লিখে দিয়ো ।
– আচ্ছা ।

তৃতীয় রাউন্ড শেষ হল । মাইকে বলল আরও দুটো রাউন্ড নাকি দিতে হবে। আমি ক্ষ্যান্ত দিলাম ।
বললাম – আর যাব না ।
বর্ণ বলল – চলেন না আঙ্কেল, খুব মজা হচ্ছিল ।
– না দ্যাখো, আমার চেয়ারের চার্জ শেষ হয়ে যাবে, এটি ব্যাটারিতে চলে । বাসায় পৌঁছতে পারব না ।
– আচ্ছা ঠিক আছে । তাহলে কাগজ কলম দেন । আমার ঠিকানা লিখে দি।
একজন স্বেচ্ছাসেবী এগিয়ে এসে কাগজ-কলম দিল ।
বর্ণ চটপট লিখে ফেরত দিয়ে বলল – আসবেন কিন্তু ! আম্মুর রান্না খুব মজা । আপনার ভাল লাগবে ।
তারপর ওরা চলে গেল ।

আমি ওখানটায় বসলাম । অনেকগুলো চেয়ারে অতিথিবৃন্দ বসে আছেন । তাদের আশেপাশে স্কুল পড়ুয়ারা ভিড় করেছে । সাদা একটি পর্দায় কতিপয় নাট্য ব্যক্তিত্বের অভিনীত একটি জনসচেতনতা মূলক নাটিকা দেখানো হচ্ছে । মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, মাথায় করে বোঝ বা ওজন নিলে হঠাৎ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে পারে । তাই মজুর, মুটেদের এ অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে ।

এবার পানাহারের পালা । এসময়ে বর্ণ আর ওর বান্ধবী এসে বিদায় নিল । বার বার ওর বাসায় যাবার প্রতিশ্রুতি নিল । আমি দিলাম । কিন্তু জানি ওর সাথে ক্ষনিকের সুখকর সান্নিধ্যের এটাই ইতি, এবং এটাই স্বাভাবিক ।

অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথ ধরলাম । মনের অতল গভীরে রয়ে গেল বর্ণ নামক শীতের সকালে এক চিলতে মিষ্টি রোদ্দুরের সাথে বর্ণিল সময় কাটানোর স্নিগ্ধ, সুখকর আবেশের মূর্ছনা । ক্ষনিকের সে মুহূর্তগুলো অনেকদিন আমার মানসপটে সুখের ছোঁয়া লেপে রাখবে ।

ভ্যালেরি, তোমায় লাল সেলাম । তোমার উদ্যোগ সম্পূর্ণ সফল । লেখাটি যেদিন শেষ করলাম সেদিন ক্যালেন্ডারের পাতায় চোদ্দই ফেব্রুয়ারি । জানেন তো কোন দিন এটি ? অবশ্যই সমগ্র বিশ্বে সার্বজনীন ভালবাসা দিবস । বিনম্র শুভ কামনা রইল সে সমস্ত বাবাদের প্রতি, যারা তাঁদের মিষ্টি কন্যাটিকে ভীষণ ভালবাসেন । দীর্ঘজীবী হোক পিতা-পুত্রির ভালবাসা…।

বিস্তারিত পড়ুন

Advertisements

আমি প্রতিবন্ধী নই…

এটি কোন গল্প বা প্রবন্ধ নয় । সাম্প্রতিক কালে আমার মনে একটি ছোট্ট অথচ গভীর ক্ষত উপসম করবার প্রয়াস মাত্র ।

আমি প্রতিবন্ধী নই...

“মেকা” (MECA) মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্রদের একান্তই নিজেদের সংগঠন । মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, সমাজের বাছাই করা গুটিকতক ছেলেদের যথেষ্ট উৎকৃষ্ট শিক্ষা ও অনুশীলনের সুযোগ করে দিয়ে ওদের আরও উৎকৃষ্ট নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে । আমিও উক্ত বিদ্যাপীঠের একজন প্রাক্তন ছাত্র । সেই বিদ্যাপিঠে অধ্যয়ন করে আমি গর্বিত । নির্দ্বিধায় এটি দেশের একটি প্রথম শ্রেণীর বিদ্যানিকেতন । অনেক উজ্জ্বল, বরেণ্য, স্বনামধন্য জনের দীক্ষার সুচনা হয়েছে এ বিদ্যানিকেতনে, ভবিষ্যতেও হবে ।

একদিন যখন আমার জীবনে অকস্মাৎ প্রতিবন্ধিত্বের বাজ ভেঙ্গে পড়ে আমার জীবনকে শৃঙ্খলের বেড় পড়িয়ে দিল, সেদিনের পর অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আমার প্রতি সহানুভূতি, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল । দুর্ভাগ্যক্রমে আমার নিজেরই সহপাঠীদের প্রতিষ্ঠান “মেকার” কাছ থেকে তেমন আশানুরূপ সাড়া পাইনি । সাহায্য নয়, সামান্য শুভানুশুভ জ্ঞ্যাত হতেও কাউকে আসতে দেখিনি । হতাশ হয়েছিলাম । প্রতিবন্ধিত্বের কারনে আমি দলচ্যুত, দলছাড়া হলাম নাকি ? যাই হোক, উপযাজক হয়ে নিজের থেকে উদ্যোগী হয়ে দলের সাথে অন্তর্ভুক্তির কোন সুযোগ পাইনি বা সে অবস্থা আমার আর ছিল না । তবে জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ক্ষেপন করার কারনে “মেকার” প্রতি এক প্রকার নস্টালজিয়া আমার মধ্যে সর্বদাই কাজ করত।

তারপর অনেক দিন গত হয়েছে । আমার ভিন্ন স্বাদের জীবনটাতে আমি সফলভাবে বিচরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি । হঠাৎ একদিন মোবাইলে, ই-মেইলে একটি আমন্ত্রন পেলাম “মেকা” ইফতার পার্টির, সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে । নস্টালজিয়া এসে ভর করল । ভাবলাম এ সুবাদে কত চেনা মুখ দেখতে পাব ! ঠিক করলাম, এ সুযোগ ছাড়া যায় না ।

ভেনুটি আমার বাসার সন্নিকটেই ছিল । তাই হুইলচেয়ার চালিয়ে খুব ফুরফুরে মন নিয়ে সময়মত পৌঁছুলাম । গিয়ে এক ঝাঁক অপরিচিত মুখের মুখোমুখি হলাম । সেই কবে কলেজ ছেড়েছি ! এরা বেশীর ভাগই আমার জুনিয়র । ইফতারের সময় হয়ে এল । একটি বড় হলঘরে ইফতারের আয়োজন হয়েছে । ওখানে এক কোনায় গিয়ে স্থান গ্রহন করলাম । হঠাৎ একজন মধ্যবয়স্ক সুদর্শন ভাই এগিয়ে এসে আমার পরিচয় ও পেশা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন । আমি পরিচয় জানিয়ে ওয়েব সাইট তৈরিতে নিজের পারদর্শিতার কথা জানালাম ।

উনি পাশেই দাঁড়ানো অপেক্ষাকৃত কম বয়সের এক প্রাক্তন ক্যাডেটকে লক্ষ্য করে নির্দেশ দিলেন – তাইলে তো ভালই হল । ওকে আমাদের “মেকার” ওয়েব সাইটের কাজ দিয়ে দাও ।

পরে জেনেছি আমার শুভান্যুধ্যায়ি ভাইটি “মেকার” প্রেসিডেন্ট । সামরিক বাহিনীর এক প্রথিতযশা অধিনায়কও বটে । আর যাকে উনি নির্দেশ দিলেন ও আমার প্রায় বারো বছরের ছোট প্রাক্তন ভ্রাতা ক্যাডেট, সাথে সাথে সে “মেকারও” সাধারণ সম্পাদক । আমার দুএকজন সহপাঠী ততক্ষণে এসে পড়েছে । ওদের সাথে ভিড়ে গেলাম ।

ইফতার পার্টি থেকে ফিরবার সময় “মেকার” প্রেসিডেন্ট ভাইটি আবারও আমাকে “মেকার” ওয়েব সাইট তৈরির কাজে আমাকে নিয়োগ দেবার সদিচ্ছার কথা প্রকাশ করলেন ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে পরে যোগাযোগ করতে বললেন ।

বাড়ী ফিরলাম চনমনে মন নিয়ে । ভাবতে ভীষণ ভাল লাগল, “মেকার” জন্য আমি কাজ করতে পারব । হ্যাঁ, অনেক দিন পর আমার আকাশে উড়তে ইচ্ছে হল। আমি “মেকার” সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারব । আমি দলচ্যুত হই নি । আমি নিজের মানুষদের সাথে আছি… ।

তারপর বেশ কিছুদিন গত হল। তা হবে প্রায় মাস দেড়েক । “মেকার” কাছ থেকে আর কিছু শুনিনি । আমার উৎসাহও মিইয়ে গেল । ভাবলাম, আরও অনেক প্রতিশ্রুতির মত আমার সিনিয়র “মেকার” প্রেসিডেন্ট ভাইয়ের প্রতিশ্রুতিও ছিল হয়ত অর্থহীন, যা আমার প্রিয় ভাইটি বোধহয় ভাবাবেগে এসে হঠাৎ করেই বেফাঁস বলে ফেলেছিলেন । তাই সেকথা আমিও প্রায় ভুলতে বসেছিলাম ।

হঠাৎ একদিন আমার সাধারণ সম্পাদক ছোট ভাইটির কল এল আমার মোবাইলে । তাঁর কথায় আমার, কলেজের প্রাক্তন ক্যাডেটদের মূল স্রোতধারায় সন্নিবিষ্ট হবার ইচ্ছা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠল। যা বোঝা গেল, নির্বাহী পরিষদের মিটিং চলছিল । উনি আমার সম্পর্কে তথ্য নিলেন । এই যেমন, আমি “মেকার” ওয়েব সাইটের কাজ করতে পারব কিনা, কত পারিশ্রমিক আশা করি ইত্যাদি । রীতিমত একটি ইন্টারভিউ । আঁচ করলাম পাশ থেকে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী বড় ভাইটি নির্দেশনা দিচ্ছেন । সাধারণ সম্পাদক ছোট ভাই জানালেন, খুব শীঘ্রই উনি ওয়েব সাইটের যাবতীয় প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ নিয়ে আমার সাথে দেখা করবেন ।

আমি যারপরনাই খুশী হলাম । দুদিন পরে ইমেইলে নির্বাহী কমিটির মিটিংএ গৃহীত প্রস্তাবসমূহের সারসংক্ষেপ পেলাম । ওতে পরিষ্কার লেখা রয়েছে আমাকে “মেকার” ওয়েব সাইটের দায়িত্ব দেয়া হল। আমি এবার নিশ্চিত এবং উচ্ছ্বসিত । আমার শুভাকাঙ্ক্ষী বড় ভাইটি ভাবাবেগে এসে প্রস্তাবটি দেননি, এ ব্যাপারে এখন আমি নিশ্চিত। ব্যাপারটিতে যতটা না আমার একটা আর্থিক আয়ের আশা ছিল, তার চাইতে বেশী নিহিত ছিল আমার অতীতের সাথে সম্পৃক্ত হবার ইচ্ছা, আমার একান্ত নিজের মানুষদের প্রতি একটি নস্টালজিক অনভুতি । তাই সাধারণ সম্পাদক ছোট ভাইকে পরিষ্কার জানিয়েছিলাম, পারিশ্রমিক একটা কিছু হলেই হবে, যে কোন মুল্যে আমি কাজটি করতে ইচ্ছুক ।

দিন যায় । আবারও সব চুপচাপ । মাঝে সাধারণ সম্পাদক ভাইটি মোবাইল করেছিল এই বলে, ওয়েব সাইটের ব্যাপারে কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করেছিল কিনা । তারপর প্রায় আরও দুমাস পর ইমেইলে দেখলাম “মেকার” আরেকটি নির্বাহী কমিটির মিটিং হয়েছে । ওতে যা পড়লাম তাতে আমার স্বপ্ন, আশা, কলেজের জন্য নস্টালজিক হয়ে যাওয়া সমস্ত কিছুই ধূলিসাৎ হয়ে গেল । কাজটি অন্য কাউকে দেবার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে । ভীষণ অপমানিত বোধ করলাম । এজন্য নয় যে আমি কয়টি টাকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছি, বরং এজন্য যে আমি আসলেই দলচ্যুত হয়েছি । কেন ? প্রতিবন্ধী বলে ? হবে হয়ত । অন্ততপক্ষে আমার মনের গহীনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বারংবার – তুই প্রতিবন্ধী । একটি বাংলা নাটকে ঠিক যেমনটি একটি ময়না পাখী বলত – তুই রাজাকার ! তুই রাজাকার ! ঠিক তেমনি আমার কানে বাজছে – তুই প্রতিবন্ধী ! – তুই প্রতিবন্ধী !

নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করলাম, হয়ত ওনাদের বিচারে আমি যোগ্য নই । কিন্তু বার বার একটি কথাই অনুভূত হচ্ছে – যোগ্যতা নয়, আমার অক্ষমতাই এই নিয়োগের পেছনে প্রধান প্রতিবন্ধক । আমি প্রতিবন্ধী, এটাই আমার একমাত্র অযোগ্যতা । বেশীর ভাগ মানুষের মনন, চিন্তা, মূল্যবোধ এখনও প্রতিবন্ধীত্বকে মেনে নেওয়ার অনুকুলে নেই। অধিকতর মানুষই প্রতিবন্ধী কাউকে মূল স্রোতধারায় প্রবেশ করতে দিতে উদাসীন, অনিচ্ছুক ।

সাধারণ সম্পাদক ছোট ভাইটিকে মোবাইলে কল করে আমার ক্ষতের কথা, যাতনার কথা, অপমানের কথা জানালাম । উনি আমার সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করলেন, আমার দুঃখে দুঃখী হলেন । বললেন উনি এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না, শীঘ্রই খবর নিয়ে কিছুক্ষন পরেই আমাকে জানাবেন । আমি জানালাম, উনি এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিলে খুশি হব । কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম উনি আমাকে প্রবোধ দেবার জন্য কথাটি বললেন । আসলেও তাই হল । ক্ষন পার হল… ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল, ওনার মোবাইল আর এল না । ঘটনাটির যথার্থই যবনিকাপাত হল । আমি অগ্রহণযোগ্যতা, উদাসীনতা, নিঃস্পৃহতা, উপেক্ষার শিকার হলাম । আমি এবারে শুধু অপমানিতই বোধ করি নি, তার সাথে মনটাও আমার খান খান করে ভেঙ্গে গেল।

আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হল, আমি প্রতিবন্ধী নই… হতে চাইনি । আমাকে তোমাদের দল থেকে বিচ্যুত কোর না । আমাকে নেও । কথা দিচ্ছি, আড়ালে থেকে আমি কাজ করে যাব । তোমাদের সামাজিক আনন্দঘন অনুষ্ঠানগুলোতে অযাচিতভাবে উপস্থিত থেকে তোমাদের অপ্রস্তুত করব না… আমার শরীরটাই শুধু অক্ষম, মন তো নয়… !!

আমার বা আমার মত প্রতিবন্ধীদের কাছে এ ধরনের উপেক্ষা নতুন কিছুই নয় । এতে আমি বা আমরা অভ্যস্ত । আমার শুধু খারাপ লাগল, কেন আমাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও কোন যথার্থ কারন না দেখিয়ে বাদ দেওয়া হল !

“মেকাকে” কটাক্ষ করার ধৃষ্টতা আমার নেই । “মেকা” অবশ্যই সমাজের উৎকৃষ্ট জনদের একটি গোষ্ঠী, যার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল প্রাক্তন ক্যাডেটদের কল্যাণে কাজ করা । তা ওনারা করছেন । আরও অনেক কল্যাণমূলক কাজও করছেন । এইতো কালই দেখলাম দুঃস্থদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করবেন তাঁরা ।

প্রতিবন্ধীদের অগ্রাহ্য করা, উপেক্ষা করা শুধু “মেকারই” নয়, জাতিগতভাবেই আমাদের বৈশিষ্ট । সবাই ওদের সমাজের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করতে ভয় পায় । অথচ এটি একটি ভুল ধারণা । সমাজের সার্বিক কল্যাণ কিন্তু ওদের সমাজের অংশ হিসেবে স্বীকার করার মধ্যেই নিহিত । শারিরিকভাবে সীমিত ক্ষমতা থাকলেও, সুযোগ পেলে এরা অসাধারন সক্ষমতা দেখাতে পারে । চাকুরী ক্ষেত্রে এরা খুবই নিষ্ঠা, সততা ও সময়ানুবর্তীতার পরিচয় দেয় ।

উন্নত দেশগুলোর মূলনীতিই হল ওদের সমাজের মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করা । অনেক বছর আগে আমি বিলেতের “সাউথ শিল্ড” নামক একটি শহরে গিয়েছিলাম পড়াশুনার অভিপ্রায়ে । ওখানে কলেজ ভবনের প্রবেশ পথের সিঁড়ির পাশে দেখলাম, লম্বা একটি ঢালু পথ । আমি ভাবলাম অহেতুক এটি কেন তৈরি করা হয়েছে ! পরে জানলাম, ওটাকে বলে “রাম্প” । ওটা হুইলচেয়ার প্রবেশের সুবিধার জন্য তৈরি করা হয় । ঐ রাম্পটি, ও কলেজ জুড়ে আরও অনেক রাম্প তৈরি করা হয়েছে কলেজ প্রতিষ্ঠার অনেক পরে, শুধু কলেজের একমাত্র প্রতিবন্ধী শিক্ষকের গমনাগমের সুবিধার জন্য ।

ভাবি, আমাদের দেশের সাধারণ মনস্তত্ত্ব এক্ষেত্রে হয়ত বলত, একটা মানুষের জন্য এত টাকা খরচ করার দরকারটা কি ? তার সাথে সাথে ভবনটির সৌন্দর্যও তো ব্যাহত হবে ! অথচ উন্নত দেশগুলো কিন্তু প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষায় আপোষহীন । পাশের দেশ ভারতও তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছে । আমাদের ক্ষেত্রে এসব এখনও বড় বড় বুলি আর বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ।

এক অনুষ্ঠানে এক শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞজনের বক্তৃতার একটি কথা খুবই মনে ধরেছিল । তিনি ডঃ সুভাগত ভট্টাচার্য, বারডেমের চিকিৎসক । উনি বলেছিলেন – বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মূল লক্ষ্য ছিল সবার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা । এখানে চিন্তা করার অবকাশ নেই যে, আমি ভাল আছি । বরং ভাবতে হবে আমরা ভাল আছি কিনা । আর তার জন্য প্রয়োজন সবার স্বাধীনতা । আমার প্রতিবন্ধী ভাই বা বোনটি স্বাধীনভাবে পথ চলতে পারছে কিনা, তার অধিকার সংরক্ষিত হচ্ছে কিনা ইত্যাদি নিশ্চিত করবার দায়িত্ব সমাজের । আমার প্রতিবন্ধি ভাই বা বোনটির সুখ নিশ্চিত করতে পারলেই বলা যাবে আমি সুখে আছি, আমরা সুখে আছি… ।

এ ধরনের একটি স্থান খোদ বাংলাদেশেই রয়েছে । যেখানে হিন্দু-মুসলমান, নারি-পুরুষ, প্রতিবন্ধী-অপ্রতিবন্ধী সবাই সুখী, সবার মুখে হাসি, শান্তি । বিশেষ করে প্রতিবন্ধীরা ওখানে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে । ওখানে কেউ মনেই করে না যে ওরা প্রতিবন্ধী । ওরা ওখানে নির্দ্বিধায় হাসছে, খেলছে, বেড়াচ্ছে, চাকুরী করছে, প্রেম করছে, বিয়ে করছে… । প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার কোন বাঙ্গালী নন, বরং একজন বিদেশিনী যিনি নিজেকে বাঙ্গালী মনে করেন । মহীয়সী এ বিদেশিনীর নেই কোন চাহিদা, নেই কোন অহংকার । বিনা লাভে, বিনা কোন শর্তে এদেশের প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন । সাহেব থেকে চাপরাশি পর্যন্ত সবার প্রতি তাঁর একই ব্যাবহার, একই সমাদরে কথা বলার ভঙ্গি । তাঁর প্রতিষ্ঠানে না চলে কোন দুর্নীতি, না চলে কোন অন্যায় । তাঁর আমন্ত্রনে সর্বদাই অনেক বিদেশী এসে এসব ভাগ্যাহত মানুষদের পাশে দাঁড়ান । ক্ষণজন্মা এই বিদেশিনীর নাম ডক্টর ভালেরি এ টেইলর । তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম সিআরপি ।

সবশেষে আমার ভুপেন হাজারিকার সেই গানের কয়েকটি পংতি মনে পড়ছেঃ
মানুষ মানুষের জন্য ।
জীবন জীবনের জন্য ।
একটু সহানুভূতি কি,
মানুষ কি পেতে পারে না…
ও বন্ধু…

ঝর্ণা মেশে সাগরে

রচয়িতাঃ শহিদুল আলম

গতরাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি । মিষ্টি একটা স্বপ্ন । কি মধুর এক অনাবিল অনুভুতি ! একদম বের হতে ইচ্ছে করছিল না স্বপ্নটা থেকে…Natural-Waterfall

একটি পাহাড়ের নিচে বেড়াচ্ছি । সাথে নুপুর, শাকিল, ময়না আর বিকাশ । আমার কলেজের সহপাঠী ওরা । পাহাড়ের গলা বেয়ে মিষ্টি, মধুর ছন্দ তুলে গড়িয়ে পড়ছে অপূর্ব একটি ঝর্ণা । কি অদ্ভুত সুন্দর সাদা ধবধবে তার ফেনারাশি । দুগ্ধফেনিল বোধ হয় একেই বলে ।

আমি চঞ্চল পায়ে ছুটে চললাম ঝর্ণার দিকে । ওদের হাত নেড়ে ডাকলাম – এই ময়না, নুপুর ! আয়, জলদি আয় ! দ্যাখ না কি সুন্দর !
যেন একটু দেরী করলেই এই পাহাড়, ঝর্ণা, সুন্দর প্রকৃতি সব মিলিয়ে যাবে কোন এক কালো জাদুর মন্ত্রবলে…
ছোটবেলা থেকেই খুব চটপটে আর চঞ্চল ছিলাম বলে আমার নাম রাখা হয়েছে ঝর্ণা । দৌড়ে অনেক পুরস্কার পেয়েছি স্কুলে । কেউ আমার সাথে পারত না । চাই ছেলে কি মেয়ে ।

ত্রস্ত পদক্ষেপে আমি পাহাড়ের পাদদেশে এসে পৌঁছলাম । এখন পরিষ্কার জলধারা স্পর্শ করতে পারছি । ওখানটায় একটা স্বচ্ছ জলাধার তৈরি হয়েছে । পাহাড়ের সবুজ, পীতবর্ণ মিশ্রিত বৃক্ষরাজির মধ্য থেকে নাম না জানা পাখির মিষ্টি কাকলি ভেসে আসছিল । পানিতে হাত দিলাম । ইশ, কি ঠাণ্ডা ! কিন্তু ওরা কই ? ওরা আসছে না কেন ? ঘুরে ওদের ডাকতে গেলাম। কই ওরা ? ওরা তো নেই ! আবার ঝরনার দিকে ফিরে তাকাতেই সব মিলিয়ে গেল। স্বপ্ন গেল ভেঙ্গে…

ফিরে এলাম বাস্তবে । সামনে এল কঠিন, রুঢ় জীবন । মফস্বল শহরে আমাদের বাসাতে অনেক জুঝবার পর আমার অভিভাবকগণ আমায় এখানে নিয়ে এসেছেন । সিআরপি নামে একটি হাসপাতালে কোন এক ওয়ার্ডে শুয়ে আছি ।

কিভাবে কি হল, আমি জানি না। গতদিনগুলো একটা ঘোরের মধ্যে কেটেছে । ছোট ভাইয়ের পিছে পিছে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে যাই । তারপরই হল এটা । প্রায় এক সপ্তাহের মত সবার বুঝতেই কেটে গেল আসলে কি হয়েছে । আমিও বুঝলাম না । বোঝার কোন চেষ্টাও করলাম না । শুধু বুঝলাম, আর কোনদিন ভাল হব না । আমার হাত-পা সব অচল হয়ে গেছে । ডাক্তার বলেছে এখানে থাকলে নাকি হাতে কিছু জোর আসতে পারে ।
কি হবে আমার ? একে তো আমার মা-বাবা গরীব । তার উপর আমি মেয়ে । একজন বিকলাঙ্গ নারীর কিইই বা মূল্য এ সমাজে ? সারা জীবন কি আমার অপরের গলগ্রহ হয়ে কাটাতে হবে ? ধিক্কার দিলাম নিজেকে । আর দেব নাই বা কেন ? আমার এ অবস্থার জন্য কেউ তো আর দায়ী নয় । আমিই দায়ী । আর আমার ভাগ্য । আর কেউ নয়… কেউ না… ।

ছোট্ট একটা দুর্ঘটনা । তার খেসারত এত ? এত বেশি ? কি হবে আমার বেচে থেকে ? আমি বাচব কার জন্য ? কিসের জন্য ?

এখানে সবাই বলছে, আমাকে নিজের জন্যই বাঁচতে হবে । আমার জীবনে নাকি এখনও অনেক কিছুই বাকি, আমার জীবন নাকি এখনও অনেক দামী । অনেক দৃষ্টান্ত দেখায় । কত নামী দামী মানুষ ! স্টিফেন হকিন্স বলে কে একজন আছেন, উনি নাকি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানি । কিন্তু আমার মনের জীবনের প্রতি আক্ষেপ, বিতৃষ্ণা কিছুতেই যায় না ।

দিন কেটে যায়… ।

এখানকার একজন আপু সোমা, আমার সাথে মাঝে সাঝে কথা বলতে আসতেন । হুইলচেয়ারে বসে আমাকে অনেক বোঝাতেন । কথাগুলো কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকত না । আপুরও নাকি এমনই সময় গেছে । এখন উনি এখানে একটা চাকুরী করেন । মন দিয়ে কাজ করেন । এই কাজই নাকি এখন তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ।

খারাপ লাগাটা কিছুটা কমে এল। তবে পুরোপুরি গেল না । মা-বাবা আগে ফোন করতেন, এখন তাও কমিয়ে দিয়েছেন ।

একদিন ওরা আমাকে হুইলচেয়ারে ওঠাল । বাইরে নিয়ে এল । অনেকদিন পর বাইরের প্রকৃতি, রোদ, গাছপালা দেখলাম । ভাল লাগল ।

এরপর প্রায়ই আমাকে বাইরে আনা হত । তারই মধ্যে একদিন অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হল । সোমা আপুই বললেন – চল, তোমাকে একটা জিনিষ দেখাই ।

যেখানটায় গেলাম আমরা, ওখানে গাছপালায় ভরা ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় । সুন্দর স্নিগ্ধ সমীরণ । এক ভাইয়া ওখানে বসে ছবি আঁকছেন । তাও আবার মুখে একটা তুলি নিয়ে । কাছে গিয়ে দেখলাম, রং-তুলিতে ফুটে উঠেছে নিপুনভাবে গ্রামবাংলার সুনিবিড় সৌন্দর্য । গ্রাম্য মেয়েরা ঢেকি ভাঙ্গছে, খোপা বাঁধছে ।

সোমা আপু জানাল, ওঁর নাম সুভাস । একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ওঁর দুটো হাতই কেটে ফেলতে হয়েছে । ছবি আঁকা শিখে উনি জীবনের নূতন মানে খুজে পেয়েছেন । অভূতপূর্ব !

একটি সুখের আবেশ নিয়ে ওয়ার্ডে ফিরলাম । তারপর নিয়মিত সুভাসদার ছবি আঁকা দেখতে যেতাম । একদিন অবাক হয়ে দেখলাম, তাঁর তুলির আঁচড়ে একটি সুন্দর ঝর্ণা ফুটে উঠেছে । অনেকটা আমার স্বপ্নের সেই ঝর্ণার মতন । এ কিসের ইঙ্গিত ? সৃষ্টিকর্তা কি আমায় কিছু বলতে চাইছেন ?

একটা উপলব্ধি হল । সোমা আপু, সুভাসদা… এরাও জীবনে অনেক কিছুই হারিয়েছেন । কিন্তু ওঁরা তো হাল ছাড়েন নি । ওঁরা একটা কিছুতে জীবনের মানে খুজে পেয়েছেন । আমিও কি পেতে পারি না !
আমিও তো মানবজাতিরই একজন । সবার মত না হোক, সবার মধ্যে থেকে আমার জীবনে এগিয়ে যাওয়া উচিৎ । ঠিক ঝর্ণার মত । ঝর্ণার জল নদীতে পড়ে স্রোতে রূপ নেয় । মিশে যায় অন্য জল, জলধারার সাথে । তারপর অন্তিমকালে সব কিছুই মিশে একাকার হয়ে যায় বিস্তৃত সাগরে ।

আমারও চলতে হবে । বহু দূর । অনন্ত, অন্তিমের দিকে… সাগরে না মেশা পর্যন্ত ।

আরও পরে একদিন আমার কলেজের বন্ধুরা চাঁদা তুলে আমার জন্য একটি অনন্য উপহার নিয়ে এল । একটি কম্পিউটার । আমি জীবনে এগিয়ে চলার একটি মানে খুজে পেলাম । তারপর… এগিয়ে চললাম…