ঝর্ণা মেশে সাগরে

রচয়িতাঃ শহিদুল আলম

গতরাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি । মিষ্টি একটা স্বপ্ন । কি মধুর এক অনাবিল অনুভুতি ! একদম বের হতে ইচ্ছে করছিল না স্বপ্নটা থেকে…Natural-Waterfall

একটি পাহাড়ের নিচে বেড়াচ্ছি । সাথে নুপুর, শাকিল, ময়না আর বিকাশ । আমার কলেজের সহপাঠী ওরা । পাহাড়ের গলা বেয়ে মিষ্টি, মধুর ছন্দ তুলে গড়িয়ে পড়ছে অপূর্ব একটি ঝর্ণা । কি অদ্ভুত সুন্দর সাদা ধবধবে তার ফেনারাশি । দুগ্ধফেনিল বোধ হয় একেই বলে ।

আমি চঞ্চল পায়ে ছুটে চললাম ঝর্ণার দিকে । ওদের হাত নেড়ে ডাকলাম – এই ময়না, নুপুর ! আয়, জলদি আয় ! দ্যাখ না কি সুন্দর !
যেন একটু দেরী করলেই এই পাহাড়, ঝর্ণা, সুন্দর প্রকৃতি সব মিলিয়ে যাবে কোন এক কালো জাদুর মন্ত্রবলে…
ছোটবেলা থেকেই খুব চটপটে আর চঞ্চল ছিলাম বলে আমার নাম রাখা হয়েছে ঝর্ণা । দৌড়ে অনেক পুরস্কার পেয়েছি স্কুলে । কেউ আমার সাথে পারত না । চাই ছেলে কি মেয়ে ।

ত্রস্ত পদক্ষেপে আমি পাহাড়ের পাদদেশে এসে পৌঁছলাম । এখন পরিষ্কার জলধারা স্পর্শ করতে পারছি । ওখানটায় একটা স্বচ্ছ জলাধার তৈরি হয়েছে । পাহাড়ের সবুজ, পীতবর্ণ মিশ্রিত বৃক্ষরাজির মধ্য থেকে নাম না জানা পাখির মিষ্টি কাকলি ভেসে আসছিল । পানিতে হাত দিলাম । ইশ, কি ঠাণ্ডা ! কিন্তু ওরা কই ? ওরা আসছে না কেন ? ঘুরে ওদের ডাকতে গেলাম। কই ওরা ? ওরা তো নেই ! আবার ঝরনার দিকে ফিরে তাকাতেই সব মিলিয়ে গেল। স্বপ্ন গেল ভেঙ্গে…

ফিরে এলাম বাস্তবে । সামনে এল কঠিন, রুঢ় জীবন । মফস্বল শহরে আমাদের বাসাতে অনেক জুঝবার পর আমার অভিভাবকগণ আমায় এখানে নিয়ে এসেছেন । সিআরপি নামে একটি হাসপাতালে কোন এক ওয়ার্ডে শুয়ে আছি ।

কিভাবে কি হল, আমি জানি না। গতদিনগুলো একটা ঘোরের মধ্যে কেটেছে । ছোট ভাইয়ের পিছে পিছে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে যাই । তারপরই হল এটা । প্রায় এক সপ্তাহের মত সবার বুঝতেই কেটে গেল আসলে কি হয়েছে । আমিও বুঝলাম না । বোঝার কোন চেষ্টাও করলাম না । শুধু বুঝলাম, আর কোনদিন ভাল হব না । আমার হাত-পা সব অচল হয়ে গেছে । ডাক্তার বলেছে এখানে থাকলে নাকি হাতে কিছু জোর আসতে পারে ।
কি হবে আমার ? একে তো আমার মা-বাবা গরীব । তার উপর আমি মেয়ে । একজন বিকলাঙ্গ নারীর কিইই বা মূল্য এ সমাজে ? সারা জীবন কি আমার অপরের গলগ্রহ হয়ে কাটাতে হবে ? ধিক্কার দিলাম নিজেকে । আর দেব নাই বা কেন ? আমার এ অবস্থার জন্য কেউ তো আর দায়ী নয় । আমিই দায়ী । আর আমার ভাগ্য । আর কেউ নয়… কেউ না… ।

ছোট্ট একটা দুর্ঘটনা । তার খেসারত এত ? এত বেশি ? কি হবে আমার বেচে থেকে ? আমি বাচব কার জন্য ? কিসের জন্য ?

এখানে সবাই বলছে, আমাকে নিজের জন্যই বাঁচতে হবে । আমার জীবনে নাকি এখনও অনেক কিছুই বাকি, আমার জীবন নাকি এখনও অনেক দামী । অনেক দৃষ্টান্ত দেখায় । কত নামী দামী মানুষ ! স্টিফেন হকিন্স বলে কে একজন আছেন, উনি নাকি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানি । কিন্তু আমার মনের জীবনের প্রতি আক্ষেপ, বিতৃষ্ণা কিছুতেই যায় না ।

দিন কেটে যায়… ।

এখানকার একজন আপু সোমা, আমার সাথে মাঝে সাঝে কথা বলতে আসতেন । হুইলচেয়ারে বসে আমাকে অনেক বোঝাতেন । কথাগুলো কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকত না । আপুরও নাকি এমনই সময় গেছে । এখন উনি এখানে একটা চাকুরী করেন । মন দিয়ে কাজ করেন । এই কাজই নাকি এখন তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ।

খারাপ লাগাটা কিছুটা কমে এল। তবে পুরোপুরি গেল না । মা-বাবা আগে ফোন করতেন, এখন তাও কমিয়ে দিয়েছেন ।

একদিন ওরা আমাকে হুইলচেয়ারে ওঠাল । বাইরে নিয়ে এল । অনেকদিন পর বাইরের প্রকৃতি, রোদ, গাছপালা দেখলাম । ভাল লাগল ।

এরপর প্রায়ই আমাকে বাইরে আনা হত । তারই মধ্যে একদিন অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হল । সোমা আপুই বললেন – চল, তোমাকে একটা জিনিষ দেখাই ।

যেখানটায় গেলাম আমরা, ওখানে গাছপালায় ভরা ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় । সুন্দর স্নিগ্ধ সমীরণ । এক ভাইয়া ওখানে বসে ছবি আঁকছেন । তাও আবার মুখে একটা তুলি নিয়ে । কাছে গিয়ে দেখলাম, রং-তুলিতে ফুটে উঠেছে নিপুনভাবে গ্রামবাংলার সুনিবিড় সৌন্দর্য । গ্রাম্য মেয়েরা ঢেকি ভাঙ্গছে, খোপা বাঁধছে ।

সোমা আপু জানাল, ওঁর নাম সুভাস । একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ওঁর দুটো হাতই কেটে ফেলতে হয়েছে । ছবি আঁকা শিখে উনি জীবনের নূতন মানে খুজে পেয়েছেন । অভূতপূর্ব !

একটি সুখের আবেশ নিয়ে ওয়ার্ডে ফিরলাম । তারপর নিয়মিত সুভাসদার ছবি আঁকা দেখতে যেতাম । একদিন অবাক হয়ে দেখলাম, তাঁর তুলির আঁচড়ে একটি সুন্দর ঝর্ণা ফুটে উঠেছে । অনেকটা আমার স্বপ্নের সেই ঝর্ণার মতন । এ কিসের ইঙ্গিত ? সৃষ্টিকর্তা কি আমায় কিছু বলতে চাইছেন ?

একটা উপলব্ধি হল । সোমা আপু, সুভাসদা… এরাও জীবনে অনেক কিছুই হারিয়েছেন । কিন্তু ওঁরা তো হাল ছাড়েন নি । ওঁরা একটা কিছুতে জীবনের মানে খুজে পেয়েছেন । আমিও কি পেতে পারি না !
আমিও তো মানবজাতিরই একজন । সবার মত না হোক, সবার মধ্যে থেকে আমার জীবনে এগিয়ে যাওয়া উচিৎ । ঠিক ঝর্ণার মত । ঝর্ণার জল নদীতে পড়ে স্রোতে রূপ নেয় । মিশে যায় অন্য জল, জলধারার সাথে । তারপর অন্তিমকালে সব কিছুই মিশে একাকার হয়ে যায় বিস্তৃত সাগরে ।

আমারও চলতে হবে । বহু দূর । অনন্ত, অন্তিমের দিকে… সাগরে না মেশা পর্যন্ত ।

আরও পরে একদিন আমার কলেজের বন্ধুরা চাঁদা তুলে আমার জন্য একটি অনন্য উপহার নিয়ে এল । একটি কম্পিউটার । আমি জীবনে এগিয়ে চলার একটি মানে খুজে পেলাম । তারপর… এগিয়ে চললাম…

Advertisements

নিয়তি

রচয়িতাঃ শহিদুল আলম

একটি ছোট্ট ঘটনা
তাতেই এই বিরাম্বনা।
এ নিয়ে কত যে রটনা !
সামনে কি আছে জানিনা ।

কেউ বলে হয়েছে পাপের সাজা
জিন-ভুতে ধরেছে
ভিন গায়ে আছে যে এক বাবা খাজা
নিয়ে চল তাঁর কাছে ।

কারো মতে জীবন আমার শেষ
কেউবা বলে হয়েছে বেজায় বেশ
বাড় বড় বেড়েছিল ওর
জীবনে হবেনা কখনও ভোর

হুইলচেয়ারে বসে ভাবি আমি
ছিল জীবন কত দামী
কখনও কি পাব না আর কোন দাম
কে ভেবেছিল, হবে আমার এহেন পরিনাম

বারমিংহামের চিঠি

রচয়িতাঃ শহিদুল আলম

আফসোস লাগে আমার
কি বলব আর ?
আমরা যারা হুইলচেয়ারে চলি
তাদের জন্যে নেই কোন রোড,
নেই ট্রান্সপোর্ট
দুঃখের কথা কি বলি ।ওদেশেই স্বাভাবিক এমন অবস্থা
ওখানকার সিস্টেমের ওপর কারো
নেই আশা, নেই আস্থা ।
হয়ত একদিন হবে ভোর ।
আমরা না হই, প্রজন্ম পর
দেখবে সবই আশার, হবে বিভোর ।অথচ দ্যাখো ।
এখানটায় সুবিধা কত !
হুইলচেয়ার চলতে কোন আসুবিধা হয় নাক ।
ঢালু করে দেয়া আছে বাধা যত ।
রাস্তায় বেরুলেই আছে সুন্দর ফুটপাত ।
আরও আছে বিশালকায় ব্ল্যাক ট্যাক্সিক্যাব ।

তারপর আছে মেট্রোরেল চমৎকার
কোথাও যেতে অসুবিধা হয় না আমার
বাসে আছে সুন্দর রাম্প সিস্টেম
লোকজনও কি অমায়িক, লাইক ফ্রেন্ড ।

একা বাঁচতে চায় না কেউ এদেশে সুখে
সবার পাশে দাঁড়ায় সবাই বিপদে ও শোকে
প্রত্যেকে বাঁচে পরের তরে
কেউ থাকে না অনাদরে ।